ব্লগার ও নাস্তিকদের হত্যার ছক ও মৌলবাদের বাংলাদেশ?
আসিফ_মহিউদ্দীন: ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি স্বঘোষিত কট্টরপন্থী নাস্তিক আসিফ মহিউদ্দীন। ঢাকার মতিঝিলে তার অফিসে ছুরিকাঘাতে আহত হন। তিনি অবশ্য সে যাত্রায় বেচে যান।অন্যদিকে চরমপন্থী ইসলামি গ্রুপ আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এর দায় স্বীকার করে, ওনারা কারণ হিসেবে এটাই বলে যে "' তুমি ইসলাম ত্যাগ করেছ, তুমি মুসলিম নও ! তুমি কোরানের সমালোচনা করো, আমাদের এটা করতেই হত "" আসিফ মহিউদ্দিন থেকেই শুরু হয় বাংলার বুকে ব্লগার ও নাস্তিকদের হত্যার ছক ???? আসিফ মহিউদ্দিন বিচার পায়নি বরং তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে ????
আহমেদ_রাজিব_হায়দার: ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। আসিফ মহিউদ্দিন কে হত্যা চেস্টা করার ঠিক ১ মাস পর । নাস্তিক ব্লগার আহমেদ রাজিব হায়দার খুন হন। তিনি সেই সময় ঢাকার সন্নিকটে মিরপুরে তার বাসা থেকে বের হচ্ছিলেন। তার মৃতদেহ যখন পাওয়া যায়, এতটা নির্মমতা যা কখনো আগে কেউ দেখেনি ???? তখন তা দেখে মনে হচ্ছিল সেটা রক্তের বন্যার উপর শায়িত হয়ে রয়েছে।তার ছিন্নভিন্ন দেহকে তার বন্ধুরা প্রথমে চিনতেই পারেনি। মৌলবাদীরা দায় স্বীকার করে এবং কারণ হিসেবে এটা বলে যে "" রাজীব হায়দার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্র ফ্রন্ট ইসলামী ছাত্র শিবিরের নিষিদ্ধতা চেয়েছিলেন এবং যুদ্ধাপরাধীদের সঠিক বিচারের জন্য সোচ্চার ছিলেন তাই তাকে হত্যা করেছে। ???? প্রকাশ্যে জামাতে ইসলামীর সদস্যরা স্বীকারোক্তি দিল যে আমরা যা করেছি ভালো করেছি।
সানিউর_রহমান : ২০১৩ সালের ৭ মার্চ । মানে রাজীব হায়দার হত্যার ঠিক ২০ দিন পর । মৌলবাদীরা ০৭ মার্চ রাতে সানিউর রহমান এর উপর আক্রমণ করেন, ঢাকার মিরপুরে পুরবী সিনেমা হলের সামনে আনুমানিক নয়টার দিকে যখন তিনি হাটছিলেন, দুইজন মানুষ চাপাতি হাতে তাকে আকষ্মিক আক্রমণ করেন। সানিউর শাহবাগ আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন যেমন: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করতেন। যার দায় স্বীকার করেন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। যদিও এ যাত্রায় সানিউর রহমান বেঁচে যায় এবং এ দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয় ।
শফিউল_ইসলাম: ২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শফিউল ইসলাম, একটিবার ভাবতে পারেন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাড় দেয়নাই ???? অথচ তার জীবনে তিনি কত ছাত্রছাত্রীকে পড়ালেখা করিয়ে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তায় পাঠিয়েছেন ????
শফিউল ইসলাম রাজশাহী শহরে তার বাড়ি যাওয়ার পথে, কিছু তরুণের দ্বারা ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে গুরুতর আহত হন। তিনি বাউল মতবাদের অনুসারী ছিলেন।তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর, তিনি মৃত্যুবরণ করেন
চরমপন্থী মুসলিম গ্রুপ 'আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ-২' এর দায় স্বীকার করে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওয়েবসাইটে তারা ঘোষণা দেয় যে, "আমাদের মুজাহিদীনরা (যোদ্ধা) আজ এক মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগকারী) কে তার প্রাপ্য সাজা দিয়েছে। বিচার কার্যক্রম এখনো চলমান আছে। ১১ বছর পার হয়ে গেছে কোন কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি ????
ব্লগার_অভিজিৎ_রায় : ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রকৌশলী এবং বিখ্যাত বাংলাদেশী ব্লগার অভিজিৎ রায় এবং তার স্ত্রী বন্যা আহমেদ ঢাকাতে দুর্বৃত্তদের দ্বারা চাপাতি হাতে হামলার স্বীকার হন।অভিজিৎ এবং তার স্ত্রী আনুমানিক রাত ৮:৩০ এর দিকে রিকশা করে একুশে বই মেলা থেকে আসছিলেন।তারা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক মিলনায়তন এর কাছে আসেন, তখনি দুর্বৃত্ত দ্বারা আক্রমণের স্বীকার হন।
যার দায় স্বীকার করেন জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট । এবং পরিকল্পনাকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াউল ইসলাম জিয়া যাকে সংক্ষেপে জঙ্গি জিয়া বলা হয় । ব্লগার অভিজিৎ রায় মারা গেল বাংলার বুক থেকে একটি মুক্তচিন্তার অভিভাবক হারিয়ে ফেললাম ????
ওয়াশিকুর_রহমান_বাবু: ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ । মানে অভিজিৎ হত্যার ঠিক ৩২ দিন পর । আরেকজন ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু , ঢাকার তেজগাঁওতে অভিজিৎ রায়ের মত খুন হন।ওয়াশিকুর রহমান বাবু কে তারা খুন করেছে কারণ ওয়াশিকুর ইসলামবিরোধী শ্লেষাত্মক লেখা লিখতেন।
যার দায় স্বীকার করে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম।
অনন্ত_বিজয়_দাশ: ২০১৫ সালের ১২ মে। মানে ওয়াশিকুর রহমান বাবু ভাই এর মৃত্যুর ঠিক ৪৩ দিন পর ।
অনন্ত বিজয় দাশ প্রকাশ্যে নাস্তিক ব্লগার ছিলেন। ছিলেন চরমপন্থীদের করা তালিকার মধ্যেও। ২০১৫ সালের ১২ মে সিলেটে চারজন মুখোশধারীর হামলায় তিনি নিহত হন। অনন্ত মুক্তমনা ব্লগে লিখতেন, তিনি তিনটি বই লিখেছিলেন, যার একটি ছিল বিজ্ঞানের উপর, একটি বিবর্তনের উপর এবং অপর একটি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপ্লবের উপর। হত্যার পর ইসলামিক স্টেট দায় স্বীকার করে।
নীলয়_চ্যাটার্জী: ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট। মানে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ এর হত্যার ঠিক ৮৭ দিন পর ছয়জন মানুষ চাপাতি হাতে তার উপর তার নিজের বাসায় হামলা চালায়। ঢাকা সংলগ্ন গোরানে তার বাসা ছিল এবং সেখানে তার মৃত্যু হয়। যার দায় স্বীকার করে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত মেজর জিয়া ।
কারণ হিসেবে বলে যে নিলয় ব্লগার ও নাস্তিক ছিল বলে।
ফয়সাল_আরেফিন_দীপন : ২০১৫ সালের ৩১ শে অক্টোবর মানে ২৪৭ দিন পর (৮ মাস ২ দিন ) জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণাধার ৪৩ বছর বয়সী ফয়সাল আরেফিন দীপন। মৌলবাদীদের দ্বারা ২০১৫ সালের ৩১ শে অক্টোবর মৃত্যুর মুখে ঢলে পরেন। তিনি বিজ্ঞানমনষ্ক-যুক্তিবাদী লেখক অভিজিৎ রায়ের বিশ্বাসের ভাইরাস প্রকাশ করেন। তিনি তার প্রকাশনা রুমেই নিহত হন। একইদিনে অন্য আরেকজন প্রকাশক আহমেদ রশীদ চৌধুরী এবং রনদীপন বসু ও তারেক রহমান নামক দুইজন লেখক অন্য প্রকাশনা রুমে ছুরিকাহত হন। এই তিনজনকেই হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং এদের মধ্যে একজন গুরুতর ভাবে আহত হন।২০২১ সালের ফেব্রুয়ারীতে আদালত দীপন হত্যা মামলায় আট জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। যা সর্বপ্রথম বিচার সম্পূর্ণ হয়েছিল ।
আহমেদ_রশীদ_চৌধুরী (টুটুল) :২০১৫ এর সালের ৩১ অক্টোবর প্রায় ২৪৭ দিন ( ৮ মাস ২ দিন ) পর আবারো মাথা চারা দিয়ে ওঠে মৌলবাদী গুষ্টি গুলি ।
৪৩ বছর বয়সী শুদ্ধস্বর প্রকাশনার মালিক আহমেদ রশীদ চৌধুরী ২০১৫ র ফেব্রুয়ারিতে বই মেলায় (এই মাসেই অভিজিৎ রায় মারা গিয়েছেন) নাস্তিক লেখকদের বই প্রকাশ করার জন্য এবং তার ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির জন্য মৃত্যুর হুমকি পান। ২০১৫ এর ৩১ অক্টোবর গুপ্তহত্যাকারীরা চাপাতি দ্বারা তাকে আক্রমণ করে, তাকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। আনসার-আল-ইসলাম এর দায় স্বীকার করে।
কারণ হিসেবে জঙ্গিরা বলে যে সে নাকি নাস্তিকদের বই প্রকাশ করছে এজন্যই তাকে খুন করতে হবে কেননা সে আল্লাহর শত্রু। ????
ড_মুহম্মদ_জাফর_ইকবাল: ২০১৮ সালের ৩ মার্চ। হঠাৎ করে ২ বছর ৪ মাস ৩ দিন পর মৌলবাদী গোষ্ঠী আবারও জেগে উঠলো।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার । সিলেট শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক এবং বাংলাদেশের গুণী সাহিত্যিক। সাহিত্যাঙ্গনে তার লেখা শিশু-কিশোরদের জন্যই বেশি। এছাড়াও অসংখ্য সায়েন্স ফিকশনের রচয়িতা তিনি।
২০১৮ সালের ৩ মার্চ তার বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠান চলার সময় মুহম্মদ জাফর ইকবাল এক আক্রমণে ছুরিকাহত হয়েছিলেন। অধ্যাপক জাফর ইকবালের মাথায়, কাঁধে এবং হাতে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাত লেগেছিল। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং তার স্ত্রীকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামে একটি ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের নামে মোবাইলে ফোনে বার্তা পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছিল। আপনি একবার চিন্তা করতে পারেন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকে তারা ছাড় দেই নাই ???? তাহলে আপনি আমি কতটা নিরাপদ???
বি:দ্রঃ ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলো তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হয়তো এর ফল উনি পেয়ে গেছে।
মনে রাখবেন প্রকৃতি কখনো ক্ষমা করে না।
#ব্লগার
#নাস্তিক
#আথাইস্ট
#blogger
#atheism
#যুক্তিবাদী
#মুক্তচিন্তক
#লালপিপড়া
#redantbd
#bangladesh
#crime